বিপত্তারিণী পুজো মানেই , দুর্বা ঘাসের সঙ্গে বাঁধা হাতের লাল তাগা , ধর্মপ্রাণ হিন্দুদের বিশ্বাস, এই তাগা হাতে পরলে তাঁকে কোনও বিপদ স্পর্শ করতে পরে না ৷ তাই বিপত্তারিণী পুজোর শেষে সকলেই হাতে ওই তাগা বাঁধেন ৷ মেয়েরা বাম হাতে ও ছেলেরা ডান হাতে এটি পরেন ………

মা বিপত্তারিণী চণ্ডী মাতার ব্রত কথা

একদিন গঙ্গাস্নান করিবার তরে।

দেবর্ষি গমন করেন জাহ্নবীর নীড়ে।।

তথায় তীরেতে বসি দেবকণ্যাগণ।

জিজ্ঞাসিলে ঋষিবরে করিয়া দর্শন।।

বিল্বপত্র ধা্ন্য দূর্ব্বা পুষ্প রাশি রাশি।

কোথা হোতে আসি দেব যাইতেছ ভাসি।।

প্রতিদিন হেতা মোরা স্নান করি যাই।

কোনো দিন এই রূপ দেখিতে না পাই।।

ত্রিকালজ্ঞ হও তুমি ওহে ঋষিবর।

তুষ্ট কর দিয়া তুমি প্রশ্নের উত্তর।।

নারদ বলেন সবে শুন মন দিয়া।

বলিতেছি সব আমি বিস্তার করিয়া।।

সৃষ্টি স্থিতি লয় হয় কটাক্ষেতে যাঁর।

তাহার স্বরূপ বর্ণনে শক্তি আছে কার।।

অনন্ত স্বরূপ তার অনন্ত মহিমা।

কে পাইবে বল তার মহিমার সীমা।।

ভিন্ন ভিন্ন রূপ ভিন্ন পূজার বিধান।

ভিন্ন ভিন্ন রূপ দিয়া করে ভক্তে ত্রাণ।।

দুই তিন লীলা তার করিব বর্ণন।

মন দিয়া সবে তাহা করহ শ্রবণ।।

দুর্গারূপে যেই ভাবে সুরত রাজায়।

রক্ষা দেবী করে এরে বর্ণ আমি তায়।।

পরম ধার্মিক রাজা সুরত রাজন।

চন্দ্রবংশে জন্ম তিনি করেন ধারন।।

শত্রুগ তার রাজ্য করিল হরণ।

গোপনে করেন তিনি অরণ্যে গমন।।

তথায় বেধস মুনি তারে মন্ত্র দিল।

দূর্গারূপ ধ্যান করি দেবীকে তূষিল।।

তুষ্ট হয়ে নৃপতিকে দিলা দেবী বর।

বর পেয়ে রাজা অতি প্রফুল্ল অন্তর।।

নিজ শত্রুগণে করি সমূলে সংহার।

নষ্ট রা্জ্য পাইলেন তিনি পুনর্ব্বার।।

মঙ্গলচন্ডীকার রূপ করিয়া ধারন।

যে লীলা করিলা দেবী শুনহ এখন।।

সদাগর ছিল এক নাম ধণপতি।

লহনা খুল্লনা তার দুইতি যুবতী।।

খুল্লনার প্রতি স্বামী ছিল পতিকূল।

স্বামীর ভয়েতে ধণী সর্বদা ব্যাকুল।।

মঙ্গলচন্ডীকা দেবী করি আরাধন।

স্বামীকে আপন বশে করে আনয়ন।।

তৎপর বাণি্জ্যে যাত্রা করে সওদাগর।

খুল্লনাকে বলে তথা আসিতে সত্বর।।

দেবীর পূজায় ছিল খুল্লনা তখন।

আসিতে পারিল না সে ত্বরা সে কারণ।।

সদাগর যেয়ে তথা বিলম্ব দেখিয়া।

ভাঙ্গিঁল দেবীর ঘট ক্রোধে দন্ড দিয়া।।

বাণিজ্যে যাইয়া কষ্ট বিস্তর পাইল।

খুল্লনার পূ্ণ্যফলে প্রাণেতে বাঁচিল।।

হেথায় খুল্লনা ল’য়ে ভাঙ্গাঁ ঘট শিরে।

দেবীর নিকট ক্ষমা চাহে সকাতরে।।

বহু বর্ষ সদাগর আসিল না দেশ।

খুল্লনা দেবীর পূজা করি সবিশেষ।।

শ্রীমন্ত বালক পুত্রে নৌকা আরোহণে।

পাঠাইয়া দিল স্বীয় পিতৃ অন্বেষণে।।

সেও বহুতর কষ্ট বিদেশে পাইয়া।

জণনী পূণ্যে ফিরে পিতাকে পাইয়া।।

দেবীর চরিত্র অন্য করিব ব্যাখ্যান।

শ্রবণ করহ তাহা সবে দিয়া কান।।

বৃন্দাবনে কাত্যায়ণী রূপে তার স্থিতি।

পুন্যাত্মা হয় পূজি ব্রজের যুবতী।।

কৃষ্ণ যাতে পতি হন এ কামনা করি।

কাত্যায়ণী ব্রত করে ব্রজের কুমারী।।

একমাস যমুনায় করে পাতঃস্নান।

তীরে উঠি দেবী মূর্তি করিয়া নির্ম্মাণ।।

অগুরু চন্দন আদি সুগন্ধি সকল।

বিবিধ প্রকার মিষ্ট নানাবিধ ফল।।

দেবীর পূজায় সব করিয়া অর্পন।

দেবীর ধ্যানে সবে হয় নিমগন।।

তারপর হবিষ্যান্ন করিয়া সকলে।

রাত্রিতে শয়ন করি থাকয়ে ভূতলে।।

এরূপ কঠিন ব্রত করে একমাস।

তাহাতে সম্পূর্ণ হয় সকলের আশ।।

সবাকারে বর দিল শ্রীনন্দন।

অচিরে সবার হবে বাসনা পূরণ।।

এইরূপ নানা স্থানে ধরি রূপ নানা।

পূর্ণ করে মহাদেবী ভক্তের বাসনা।।

দেবর্ষী বলেন শুন দেবকণ্যাগণ।

হইল দেবীর তিন লীলা বর্ণন।।

তাঁহার অনন্ত লীলা অনন্ত মহিমা।

অনন্ত বলিয়া যার না পাইল সীমা।।

বিপদ্-তারিণী ব্রত হয় যে প্রকার।

এখন বর্ণিব সেই লীলা চমৎকার।।

একদিন নানা স্থানে করিয়া ভ্রমণ।

উপণীত হইলাম কৈলাস ভুবন।।

দেখিলাম হর গৌরী বসি একাসন।

নানাবিধ তত্ব কথা করে আলাপন।।

হেনকালে পদ্মা আসি জিজ্ঞাসিল মায়।

বল দেবী কি কারণে সকলে তোমায়।।

বিপদ্-তারিণী নামে অভিহিত করে।

তোমাকে পূজিয়া কার দুঃখ গেল দূরে।।

পদ্মার মুখের প্রশ্ন শুনি ভগবতী।

বলিতে লাগিল তবে শঙ্করের প্রতি।।

দেখ নাথ পদ্মা মোর দাসীর প্রধান।

কৃপা করি প্রশ্নে কর উওর প্রদান।।

শ্রীমুখে করিল যাহা শঙ্কর বর্ণন।

বলিতেছি তাহা সবে করহ শ্রবণ।।

আষাড়ের শুক্ল পক্ষে দ্বিতীয়ার পরে।

শণি বা মঙ্গলবার যেই দিন পড়ে।।

সেই দিন অতিশয় হয়ে সাবধান।

যথাবিধি দেবী পূজা কর সমাধান।।

পূর্ব্বদিনে হবিষ্যান্ন করি যথারীতি।

পরদিন শুদ্ধভাবে ব্রতে হবে ব্রতী।।

সফল পল্লব দিয়া ঘটের উপর।

সঙ্কল্প করিয় ঘট স্থাপ তারপর।।

বিবিধ নৈবেদ্য ফল বিবিধ প্রকার।

তন্ডূল নির্মিত রম্য পিষ্টকাদি আর।।

অখন্ডিত গুয়া পান আর তাতে ধরি।

প্রতি দ্রব্য সাজাইবে ত্রয়োদশ করি।।

এই ভাবে দ্রব্য সব করি নিবেদন।

বিপদ্-তারিণী মায়ে করি আয়োজন।।

বিপদ্-তারিণী মায়ে কর নিবেদন।

অনন্তর যত্নে বিপ্রে করায়ে ভোজন।

উপবীত সহ কর দক্ষিণা অর্পণ।।

ভক্তিভাবে এই ব্রত করে যে রমণী।

সদা রক্ষা করে তারে বিপদ্-তারিণী।।

পুত্রবতী হয়ে সেই সুখে কাঁটে কাল।

কখনো ভুগে না কোন আপদ জঞ্জাল।।

পুজোর উপকরণের পুষ্প, ফল, ইত্যাদি সবকিছুই ১৩টি করে নিবেদন করতে হয় , এমনকি হাতে ধারণ করার লালসুতোটিতেও ১৩টি গ্যাট / গ্রন্থি দেওয়ার বিধান রয়েছে। ঘট‚ আমের পল্লব‚ শীষ সমেত ডাব‚ একটি নৈবেদ্য‚ তেরোরকম ফুল‚ দু ভাগে কাটা তেরো রকম ফল । আলাদা ঝুড়িতে তেরোটা গোটা ফল‚ তেরো গাছি লালসুতো‚ তেরোটি দুর্বা‚ তেরোটি পান ও তেরোটি সুপুরি দিতে হয় ।


দেবী ভগবতী / মা কালী শুধু জবা ফুলেই তুষ্ট থাকেন, তাই মায়ের পুজোয় লাল জবা অতি আবশ্যক, লাল জবা ফুলের পুষ্পাঞ্জলি দ্বারাই মায়ের পুজো সম্পন্ন হয়

পুজোর শেষে পুরোহিতকে যথাসাধ্য দান-ধ্যান ও দক্ষিণা দিতে হয় এবং পুজোর শেষে মন দিয়ে ব্রত কথা শুনতে হয়। ব্রতের আগের দিন নিরামিষ আহার করতে হয় , ব্রতের দিন পুজো করে ব্রতকথা শুনে ফল-মিষ্টি বা লুচি খেয়ে উপোস ভাঙেন ভক্তরা ৷ এরপরেই লাল সুতোয় তেরোটি গিঁট দিয়ে তেরোটি দূর্বা বাঁধতে হয়। উচ্চারণ করতে হয় বিপত্তারিণীর মাতার মন্ত্র ৷