ছন্দা চ্যাটার্জী বাঙালির কাছে একটি অতি পরিচিত নাম। যাত্রা, সিনেমা, ছোটো পর্দা, নাটক, আকাশবানী থেকে শুরু করে সব মাধ্যমেই তিনি সাবলীল ভাবে চুটিয়ে অভিনয় করেছেন। আপামোর বাঙালিকে তিনি মোহিত করে রেখেছিলেন। তাঁর অভিনয় জীবনের ৬৮ বছরে তিনি বাঙালির অতি কাছের হয়ে উঠেছেন। যাত্রায় অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে গ্রাম বাংলার মানুষের হৃদয়ে স্হান পেয়েছেন। তাঁর অভিনয় শৈলি তাঁকে অভিনয়ের চূড়ায় নিয়ে গিয়েছে। তিনি ছিলেন অলরাউন্ডার অভিনেত্রী। যাত্রায় দীর্ঘ বছরের অভিনয় তাঁকে দিয়েছে যাত্রালক্ষ্মী’ ‘যাত্রাসম্রাজ্ঞী’ সহ আরো উপাধী। গ্রাম বাংলার যাত্রা মোদী দর্শকের কাছে উনি হয়ে উঠেছিলেন নয়নের মনি। আজো তাঁর অভিনিত যাত্রা পালার অভিনয় মানুষের মনে ফেরে। যেমন তাঁর অভিনয় তেমন তাঁর গান। নট্ট কোম্পানী,সত্যমবর অপেরা,নবরঞ্জন অপেরা,আর্য্য অপেরা,গনবাণী অপেরা,সত্যনারায়ণ অপেরা,গণবন্দনা অপেরা,গন্ধর্ব্য অপেরা সহ বিভিন্ন যাত্রা পালায় উনি চুটিয়ে ২১ বছর অভিনয় করেছিলেন। তাঁর অভিনিত বিখ্যাত যা্ত্রা পালাগুলির অন্যতম হল একদিন রাত্রে, কাঁচের স্বর্গ,আঁধারে আলো, লায়লা মজনু,মহুয়া,সাহেব বিবি গোলাম, কাশ্মীরি কলি,মুঘলআজম,নটি বসন্ত সেনা, দামামাই বাজে, ঈশ্বর তুমি চোর,শাহাজাদি,দ্রৌপদি,শকুন্তলা,শ্রীরাধা,একটি মেয়েই একটি পৃথিবী,সুখের পৃথিবী এছাড়াও উনি আরো অনেক পালায় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।

দীর্ঘ সময় উনি নাটকে অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনয় পটুতা বাংলার নাটককে করেছে সমৃ্দ্ধ। উৎপল দত্ত নির্দশিত ও অভিনিত বাংলা নাটক টিনের তলোয়ারে’ তাঁর অভিনিত ময়না চরিত্রটি আজো দাগ কেটে যায়। ময়না আর ছন্দা চ্যাটার্জী একপ্রকার সমার্থক হয়ে গিয়েছিল। পাহাড়ী সান্ন্যাল ওনাকে ভীষন স্নেহ করতেন। টিনের তলোয়ার দেখার পর পাহাড়ী সান্ন্যাল ছন্দা চ্যাটার্জীকে বলেছিলেন ‘তুই যদি আমার থেকে বড় হতিস তাহলে তোকে প্রণাম করতাম’। উত্তমকুমার ওনার নাটকের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। ক্যালকাটা থিয়েটারে বিজন ভট্টাচার্যের রচিত, নির্দেশিত ও অভিনিত নাটক দেবীগর্জনে উনি বিশেষ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। এছাড়া উনি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অনুপ কুমার, তরুন কুমার, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়,সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়,ঠাকুর দাস মিত্র,জহর রায়,গীতশ্রী দেবী,মলিনা দেবী,সরজুবালা,কেতকী দত্ত সহ আজকের শুভাশীষ মুখার্জী,পার্থ সারথী দেব, দেবশঙ্কর হালদারের সঙ্গে সাবলীল ভাবে অভিনয় করে চলেছেন।  

বেতার নাটকেও উনি চুটিয়ে অভিনয় করেছেন। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ওনাকে ভীষন স্নেহ করতেন। কোনো বিশেষ চরিত্র হলেই ওনাকে তৎক্ষণাৎ ডেকে পাঠাতেন। দীর্ঘ বছর উনি চুটিয়ে বেতারে অভিনয় করেছেন। ওনার অভিনয় তৎক্ষণাৎ আমাদের চরিত্রের মধ্যে ঢুকিয়ে দিত। খুব অল্প সময়ের মধ্যে উনি বেতারে অভিনয়ে জনপ্র্রিয়তা অর্জন করেন।বেতারে উনি শম্ভু মিত্র,তৃপ্তি মিত্র,ভানু বন্দোপাধ্যায়,রুদ্র প্রসাদ সেনগুপ্ত সহ নামী দামী অভিনেতা ও অভিনেতৃদের সঙ্গে অভিনয় করেন।   

শুরু থেকে আজ অবধি তিনি চুটিয়ে সিনেমা করে চলেছেন। সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক থেকে একটু অন্য ধারার ছবিতে উনি অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনিত কিছু বিখ্যাত সিনেমা হল সাজবাতির রূপকথারা, ফালতু, ১০০% লাভ,সাত ভাই চম্পা, পরমা,কালবেলা,পাষানি,সু্টকেস,সিসিটিভি,অচিন পাখি এছাড়াও উনি আরো অনেক সিনেমাতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর অভিনিত সাজবাতির রূপকথারা’ সিনেমাটিতে তাঁর অভিনয় যথেষ্ঠ প্রশংসিত হয়েছিল। ২০১৬ সালে সোম চক্রবর্তী পরিচালিত উজানতলী’ সিনেমাতে অভিনয়ের সুবাদে তাঁকে কোচি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর সম্মান প্রদান করা হয়। যা এক লহমায় ছন্দা চ্যাটার্জীকে অনেক উুঁচু স্হানে জায়গা করে দিয়েছে।

এবার আসা যাক ছোট পর্দায়। ছোটপর্দায় বিভিন্ন সিরিয়ালে অভিনয়ের সুবাদে তাকে ঘরে ঘরে এক ডাকে চেনে। কত যে সিরিয়ালে উনি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনিত কয়েকটি বহুল প্রচলিত সিরিয়ালের নাম হল শান্তিনিকেতন,জন্মভূমি,আস্হা,প্রতি চুয়ান্ন মিনিটে, প্রতীক্ষা একটি ভালবাসা, অপরাজিত, রাঙিয়ে দিয়ে যাও, মৌচাক,বিয়ের স্কুল, বামাক্ষ্যাপা, দ্বিরাগমন, জয় কালি কলকাত্তাওয়ালী, দেবীচৌধুরাণী এছাড়াও অগনিত সিরিয়ালে উনি অভিনয় করেছেন।

অভিনয় পিপাসূ অভিনেত্রী আজও ভাল চরিত্রের খোঁজে ফেরে। তবে বয়সের কারণে তাঁর অভিনয়ের পরিধি আস্তে আস্তে কমিয়ে আনছেন। তবু আমরা দীর্ঘবছর ওনার অভিনয় দেখতে চাই।

ছন্দা চ্যাটার্জীর সাক্ষাতকার নিয়েছেন শ্রী ভিক্টর ঘোষ