ভারতে পাট শিল্প

পূর্ব ভারতে যত শিল্প রয়েছে তার মধ্যে পাট শিল্প হল অন্যতম ভারতে যত শিল্প রয়েছে তার মধ্যে পাট শিল্প হল পুরাতন শিল্প বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ প্রায় ৪০ লাখ পরিবার এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে যুক্ত এর মধ্যে প্রায় . লাখের বেশী লোক এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত 

পাট শিল্প জাত বিভিন্ন জিনিষ

পাট শিল্পজাত বিভিন্ন জিনিষ পাওয়া যায়। যেমন কার্পেট, পাপস, দড়ি,সাজাবার জিনিষ তৎসহ বিভিন্ন জিনিষ।

পাট গাছ

ভারতে জুট মিলের সংখ্যা

ভারতে বর্তমানে মোট ৭৮ টি জুট মিল আছে। এর মধ্যে ৬১ টি জুট মিল রয়েছে বাংলায়। পশ্চিম বাংলার ৬১ টি জুট মিল রয়েছে হুগলী নদীর দুই পাড়ে। বিহার ও উত্তর প্রদেশে ৩টে করে জুট মিল রয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশে রয়েছে ৭ টি।আসাম,ওড়িশা,ত্রিপুরা, ও ছত্রিশগড়ে রয়েছে ১ করে।

ভারতে পাট কোথায় পাওয়া যায়

পূর্ব ভারতে প্রধানতঃ পাট চাষ হয়। পাট চাষ মূলত ভারতের সাতটি রাজ্য যথাক্রমে পশ্চিমবঙ্গ,বিহার,উত্তর প্রদেশ,আসাম,ত্রিপুরা, ও মেঘালয়ে হয়। এছাড়া অন্যত্র অল্প পরিমানে হয়।

বাংলায় পাট শিল্পের প্রতিষ্ঠা

ডান্ডি জুট ব্যারনস এবং ব্রিটিশ ইন্ডিয়া কোম্পানী পশ্চিম বঙ্গে একযোগে প্রথম জুট মিল প্রতিষ্ঠা করেন।

ভারতে পাট উৎপাদনের বৃহত্তম রাজ্য

ভারত হল কাঁচা পাট এবং পাট জাত দ্রব্যের বৃহত্তম উৎপাদক। বাংলাদেশ হল বিশ্বের বৃহত্তম পাটজাত দ্রব্যের রপ্তানীকারী দেশ। তারপর ভারত। ভারতে মোট ৮০ টি জুট মিল রয়েছে।তার মধ্যে অধিকাংশ জুট মিল পশ্চিমবঙ্গের হুগলী নদীর দু ধারে অবস্হিত।

ভারতের প্রথম জুট মিল

ভারতের প্রথম পাটকল এই অঞ্চলেই করে উঠেছিল। ভারতের ১৮৫৫ সালে প্রথম জুট মিল স্হাপন হয়েছিল পশ্চিম বঙ্গের রিষড়াতে। হুগলী নদীর তীর বরাবর এই জুট মিল গড়ে উঠেছিল। মিস্টার জর্জ অকল্যান্ড ওই সময় ডান্ডের কাছ থেকে জুট মেশিন কিনে রিষড়ায় জুট মিল গঠন করেন। হুগলি শিল্পাঞ্চলের প্রধান শিল্প হল পাট শিল্প। বর্তমানে এই শিল্পাঞ্চলে মোট ৬০ টি পাটকল রয়েছে। যা ভারতবর্ষের মোট পাটকলের ৭৪ শতাংশ। পাটকল গুলি প্রধানত বজবজ, বিড়লাপুর, উলুবেড়িয়া, সাঁকরাইল, টিটাগড়, জগদ্দল, কাঁকিনাড়া, ভদ্রেশ্বর, আগরপাড়া ও বালি এলাকায় গড়ে উঠেছে। সবচেয়ে বেশি পাটকল রয়েছে টিটাগড়, উলুবেড়িয়া, বালি ও বজবজ এলাকায়।

পাট

১৮৮৫ সালে জর্জ অকল্যান্ড একজন বাঙালি অংশীদার (শ্যামসুন্দর সেন) নিয়ে কলকাতার হুগলি নদী তীরবর্তী রিশড়া নামক স্থানে প্রথম পাটকল স্থাপন করেন। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলায় পাট উৎপাদিত হত। কিন্তু ১৮৮৫ সালের পূর্বে স্থানীয় তন্তুবায় শ্রেণি দরিদ্র জনগণের জন্য মোটা বস্ত্র তৈরি করত। পাটভিত্তিক শিল্প স্থাপনের অনুপ্রেরণা আসে স্কটল্যান্ডের ডান্ডি থেকে। নেপোলিয়ানের যুদ্ধের সময় ঘন ঘন নৌ-অবরোধের ফলে রাশিয়ার শন জাতীয় গাছের কারখানাগুলি বিকল্প হিসেবে পাট ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে। ১৮৩২ সালে বেলফোর ও মেলভিলের কারখানাগুলি কলকাতার বিভিন্ন স্থান থেকে কাঁচাপাট আমদানি করে এবং এই কাঁচাপাটের সঙ্গে তিমির তেল ও পানি মিশিয়ে পাট নরম করে নেয়। ১৯৩৮ সালে এই নতুন প্রক্রিয়া প্রয়োগ করা হয়। এ সময় ডান্ডির মিলগুলি জাভা থেকে আমদানি করা চিনির জন্য ডাচ সরকারের নিকট থেকে বিপুল পরিমাণ ব্যাগ তৈরির কার্যাদেশ পায়। ডাচ সরকার এই তৈরিকৃত পাটের ব্যাগ গ্রহণ করে এবং এই মোটা ক্যানভাস বিশেষ সামগ্রী হিসেবে স্থায়ীরূপ লাভ করে। এই ব্যবস্থা কাপড় ও ব্যাগ উৎপাদনে পাটের ব্যবহার শুরুতে সহায়তা করে। ফলে পাটশিল্পে নতুন প্রেরণার সূচনা হয়। অবশ্য ক্রিমিয়ার যুদ্ধই (১৮৫৪-৫৬) প্রকৃতপক্ষে পাটশিল্পকে একটি শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করে। বিশ্ববাণিজ্য প্রতি বছর শতকরা ৫ ভাগ বৃদ্ধি পেতে শুরু করলে ঔপনিবেশিক অঞ্চল থেকে বিকল্প অাঁশ সহজলভ্য হলে ডান্ডির কারখানাগুলি আর অলসভাবে বসে থাকে নি। আমেরিকার গৃহযুদ্ধ (১৮৬১-৬৫) এই বিকল্প প্রক্রিয়ায় আরো উৎসাহ প্রদান করে। এই যুদ্ধের ফলে আমেরিকা থেকে তুলার সরবরাহ অনেকাংশেই সীমিত হয়ে পড়ে। কারণ পরিখা যুদ্ধকালে ইউনিয়ন এবং কনফেডারেসির সৈন্যদের জন্য মোটা বস্তা ও বালির বস্তা, পাটের অাঁশ দিয়ে পাকানো সুতা, দড়ি সরবরাহ বিঘ্নিত হয় এবং মূল্যও বৃদ্ধি পায়। ফলে ডান্ডির টেকসই বিকল্প অাঁশের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। উভয় ক্ষেত্রেই এই শিল্প নতুন ব্যবহারকারীর সন্ধান পায় যারা আর কখনো শন বা তুলার ব্যবহারে ফিরে যায় নি। এই স্থায়ী পরিবর্তনের প্রধান কারণ ছিল তুলনামূলকভাবে পাটের সস্তা দামের সুবিধা।

এভাবে প্রথম যখন বাংলায় পাটকল স্থাপিত হয় তখন ডান্ডির মিলগুলি সুপ্রতিষ্ঠিত এবং তাদের পণ্যের জন্য নতুন বাজারের সন্ধান করছিল। কিন্তু কলকাতার মিলগুলি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দ্রুত অগ্রগতি সাধন করে। ১৮৮২ সালে  মিলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ১৮টিতে উন্নীত হয় এবং ১৯০১ সালে ৩ লক্ষ ১৫ হাজার সুতা কাটার টাকু, ১৫ হাজার তাঁত, ১ লক্ষ ১০ হাজার শ্রমিক এবং ৪ কোটি ১০ লক্ষ টাকার পরিশোধিত মূলধন নিয়ে মিলের সংখ্যা ৩৫-এ উন্নীত হয়। এখানে উৎপাদিত ৮৫% পাটজাত দ্রব্য অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা হয়। এভাবে উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে পাট শিল্প উপমহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পে পরিণত হয় এবং কলকাতা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাটজাত দ্রব্য উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হয়।

ঘটনাক্রমে সব পাটকল রাজধানী শহরের আশেপাশে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিদেশি পুঁজিপতিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তবে বাঙালিরা এই শিল্পের সঙ্গে আদৌ জড়িত ছিল না, শুধুমাত্র একজন প্রথম পাটকল স্থাপনের অংশীদার ছিলেন। পাটজাত দ্রব্য উৎপাদনের কারখানা কলকাতা কেন্দ্রিক গড়ে উঠার পিছনে কিছু সহায়ক উপাদান কাজ করে। এগুলি ছিল কম শ্রম-মূল্য (প্রায় ১/৩ ভাগ), কাঁচাপাটের সহজলভ্যতা, দীর্ঘ সময় কাজ করানো এবং অধিকতর মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন।

বিশ শতকের প্রথম তিন দশক থেকে পাটশিল্পের অভাবিত উন্নতি সাধিত হয়। ১৯০৩-০৪ সালে পাটকলের সংখ্যা ছিল ৩৮টি, কিন্তু ১৯২৯-৩০ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে ৯৮টিতে উন্নীত হয়। উৎপাদনের দিক থেকে স্থাপিত তাঁতের সংখ্যা ৩ গুণ বেড়ে যায় এবং এই শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকের সংখ্যা ১,২৩,৬৮৯ থেকে ৩,৪৩,২৫৭ জনে উন্নীত হয়। এর মূল কারণ ছিল বিনিয়োগকৃত অর্থ থেকে উচ্চ মুনাফা। বিশ্ববাজারে পাটজাত দ্রব্য সামগ্রীর চাহিদার কারণেই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়।

পাটের বৃহত্তম উৎপাদক দেশ

ভারত হল পৃথিবীর বৃহত্তম পাট উৎপাদক দেশ। যেখানে বার্ষিক উৎপাদনের পরিমান ১.৯৬৮ মিলিয়ন টনের বেশী।

বাংলাদেশ হল পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম পাট উৎপাদক দেশ। যেখানে বার্ষিক উৎপাদনের পরিমান ১.৩৪৯ মিলিয়ন টনের বেশী।

বর্তমানে পাটের বাণিজ্যিকরণ কমছে  

বর্তমানে পাটের বাণিজ্যিকরণ কমছে। কারণ কৃত্তিম উপায়ে তৈরী নাইলনের ব্যবহার বাড়ছে। পাটের খরচ বেশী হওয়ার কারণে অনেকে পাট জাত জিনিষের থেকে মুখ সরিয়ে নিচ্ছে।    তাই পাটের থেকে নাইলন জাতীয় জিনিষের কদর বাড়ে।